একটি খুনের তৃষ্ণা

প্রকাশিত: ৩:৩৮ অপরাহ্ণ, মে ১৬, ২০২০

একটি খুনের তৃষ্ণা

.

• হাসান মেহেদী

.

পত্রিকার পেইজ মেকআপের কাজ শেষ করে যখন বাসার উদ্দ্যেশ্যে টেক্সিতে উঠি তখন রাত দেড়টা। মানে একদিন পর বাসায় ফেরা! কাগজে কাজ করায় রাত-বিরেতে বাসায় ঢোকাটাই যেনো নিয়ম হয়ে গিয়েছে। কোনদিন আগেভাগে ফিরলেই বরং  কেমন জানি অনিয়ম ঠেকে! তবে শায়লা অভ্যস্ত বিধায় রক্ষে। নতুবা বিপদ ছিলো আরকি। আমার বাসার পাশেই ড্রাইভারের বাসা। ফলে লাভ হয়েছে এই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সে-ই অফিসে দিয়ে আসে এবং রাতে বাসায় পৌঁছে দেয়। এ কারণে দু’বছর যাবত অফিসে যাওয়া-আসায় রাজার সিএনজি টেক্সিই ভরসা। রাজার পুরো নাম রাজা মিয়া। ভাল নাম আবুল কালাম। তবে এই নামটি ‘রাজা মিয়া’র নিচে চাপা পড়েছে।  ছোট বেলা থেকেই শহরেই রাজা মিয়ার বাস। বয়েস পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন। তবে অনুমান করে বললে নির্ঘাত ভুল হবে। পোক্ত তাগত দেখে বোঝার উপায় নেই সল বয়েস কতো। রাজার গাড়িটি শ্বশুরের দেয়া সম্পত্তি। মূল্য হিসেবে তার চেয়ে বছর পাঁচেকের বড় শ্বশুর আলী মিয়ার আদরের কৃষ্ণকালো মেয়েটির পাণী গ্রহণ করা। রাজাও পুলকিত বদনে প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। প্রস্তাবটি প্রথমে নিয়ে আসে তার বাল্যবন্ধু মনির। মনিরের প্রস্তাব মতো কাজল আক্তারকে ঘরে তোলায় রাজার আজ এমন সুদিন। রাজার অনুরোধেই তাকে ‘রাজা মিয়া’র পরিবর্তে ‘রাজা’ বলে ডাকি। ওর যুক্তি ‘মিয়া’ বলা হয় বড় ভাইদের। ও বলে- স্যার, আপনি যখন রাজা মিয়া কইয়া ডাকেন আমার শরম করে। বছর দুইয়ের ব্যবধানে রাজার সাথে আমার অনেকটা আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে ও প্রায়ই গাড়ি চালাতে চালাতে এটা ওটা শেয়ার করে আমার সাথে। আমি ওর সাথে । রাজা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে। মাঝে মাঝে ও এমন শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে মনেই হয় না ওর লেখা-পড়ার দৌঁড়  এতো কম। আমি মনে মনে ওকে সমীহ করি। ও যখন আলোচনা শুরু করে আমি চুপ থাকি। শুনি। ওর কথায় ধার আছে। যুক্তি আছে। ফলে ওর কোন প্রস্তাব আমি উড়িয়ে দিতে পারি না।

-স্যার, একটা প্রশ্ন করবো? হঠাৎ গাড়ির গতি কমিয়ে বললো রাজা।
-কি প্রশ্ন? সিগ্রেটের প্যাকেট খুলতে খুলতে বললাম আমি।
-আপনি সাংবাদিক মানুষ। অনেক দূর পড়ালেখা করেছেন।আপনি কি আমাকে একটা জিনিস বলতে পারেন।
ওর ভণিতা শুনতে ধৈর্যে কুলোচ্ছে না আমার।
-আসল জিনিসটাই বলো না। খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বললাম। গাড়ির গতি আরো কমিয়ে দিল রাজা। বললো- স্যার, মানুষ খুন করলে কি খুব বড় পাপ হয়? কথার মর্ম বুঝে উঠার আগেই আমার হাতের  জ্বলন্ত সিগ্রেট খসে পড়ে। ওর মতিগতি বোঝার চেষ্টায় জিজ্ঞেস করলাম – কী বলছো কী তুমি? বুঝতে পারছিলাম না ওর শিকার আসলে কে? আমার গলার স্বরও খানিকটা অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যতোটা পারা যায় বিষ্ময় চেপে রাখার চেষ্টা করলাম। রাজা বললো – বঙ্গবন্ধুকে যারা খুন করেছে তাদের কমপক্ষে একজনকে আমি খুন করতে চাই।  আমি ঘামছি।  ওর মাথা ঠিক আছে তো? গত দু’ বছর এমনতর কথা তো ওর মুখে শুনিনি। আমি ভাবনার থই পাচ্ছি না। আমার অবস্থা বুঝতে না দিয়ে বললাম – তোমার কোন অসুবিধা হয়নি তো রাজা? সময় না নিয়েই ও জবাব দেয় – স্যার, আমি খুবই ঠিক আছি। এখন ওর কণ্ঠ আমার কাছে অচেনা লাগে। সেই দু’বছর থেকে শুনে আসা গলার স্বর হটাৎ অপরিচিত ঠেকে। আমি ঘাবড়ে যাই। রাজা বলে চলে- আমায় ভুল বুঝবেন না স্যার। আমি খেটে খাওয়া মানুষ। জীবনে কোনদিন রাজনীতি করিনি। রাজনীতি বুঝিও না। তবে একটা জিনিস বুঝি- বঙ্গবন্ধু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর ডাকে মানুষ দলে দলে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। সবাই যেনো সেদিন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার পেছনে ছুটে চলেছিলো।  আমি তখন সাত কি আট বছর বয়সের বাচ্চা। অত কিছু বুঝতাম না। না বুঝলেও এটা ঠিক বুঝতাম যে  ‘শেখ সাহেব’ নামে একজন মানুষ আছেন। সেই মানুষটা জাদু জানেন! তাঁর কণ্ঠে জাদুর ক্ষমতা আছে। রাজা বলে চলে। ওর কথায় আমার ভাবান্তর ঘটে। আমি শুনে যাই।  পঞ্চম শ্রেণি পাস পঞ্চাশোর্ধ টেক্সি চালকের আমি এক মুগ্ধ শ্রোতা।  টেক্সির গতি সাবলীল।  রাজা মিয়ার কণ্ঠ তেজময়।আন্দরকিল্লা মোড়ে এসে রাজা বামদিকে গাড়ি চালাতে লাগলো। মিনিট পাঁচেক পর আবার ডান দিকে মোড় নিলো সে। এবার গাড়ির গতি বেড়ে গেলো। রাজা বলে চলে। তাঁর কণ্ঠ চড়া হয়। – বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছিলো তারা জারজ সন্তান। যারা পিতাকে হত্যা করতে পারে তারা জারজ না কী আপনিই বলুন স্যার। আমি মোহাবিষ্টের মতোই সায় দিলাম – অবশ্যই। গাড়ি ছুটে চলে।  আমার ভাবনার বিন্দু শাখা মেলে।
আমি ভাবতে থাকি- আমি আজ রাজা মিয়ার গুণমুগ্ধ  ভক্ত। রাজা মিয়া লালদিঘি মাঠের তুখোড় বক্তা, আমি গাঁয়ের সাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন  তাঁর রাজনৈতিক কর্মী। কিংবা আমি সুবোধ ছাত্র, রাজা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাজ্ঞ অধ্যাপক।

– স্যার, নামবেন না।
রাজার তাগাদায় সম্বিত ফিরে ফেলাম। বাসার গেটে এসে গেছি। গাড়ি থেকে  নামতেই বুঝতে পারলাম গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে মেঘহীন আকাশ থেকে।  ওকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে গেট খোলে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি আর ভাবছি রাজার কথাগুলো। রাতের খাবার না খেয়েই শায়লার কথার ‘হু’ ‘হ্যাঁ’ একটি দুটি জবাব দিয়ে শুয়ে পড়লাম। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছি। ঘুম আসছে না। রাজার কথাগুলোই ভাবছি। তাঁর কথা থেকে অস্পষ্ট টুকরো টুকরো ছবি ভেসে আসছে মনের কোণে। সুঠাম সৌম্য রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে পাথুরে মেঝেতে। সেই দেহ আগলে রেখেছে আরো কিছু মৃতদেহ। খানিক দূরে আস্ফালন করছে কিছু অপরিচিত জন্তু। কখন বিছানা ছেড়ে বারান্দায় উঠে আসলাম বলতে পারবো না।  হঠাৎ খেয়াল হলো – জানালার ফাঁক গলিয়ে ফিকে আলো উঁকি দিচ্ছে। রাস্তায় অস্পষ্ট দেখা গেলো  দু’টি ছায়া মূর্তি। অন্ধকারে তাদের ঠাহর করা যাচ্ছে না। গুন গুন কথা শুনা যাচ্ছে। ছায়ামূর্তিগুলো নড়াচড়া করায় দুইয়ের অধিক বলেও মনে হচ্ছে। আকস্মিক একটি নেকো সুরের মেয়েলী কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। চাপা কান্না। একটি ল্যাম্পপোস্টের দিকে নজর পড়লো। ঈষৎ আলোতে বোঝা গেলো দু‘টি ছায়া যেনো লেপ্টে আছে। তাদের নিয়ে না ভেবে শুন্যে দৃষ্টি রেখে রাজার কথাগুলো ভাবতে লাগলাম। হঠাৎই তীক্ষ্ম একটি নারী কণ্ঠ শুনে ভাবনায় ছেদ পড়লো। অশ্লীল ভাষায় কাউকে গালাগাল দিচ্ছে মেয়েটি। একটি বাক্য কানে আটকে গেলো-
“ট্যাহা না থাকলে এইহানে আহস ক্যান শালা। তুর জামা-কাপড় খুইল্লা রাখুম মাগির পোলা।”
আর শুনতে চেষ্টা করলাম না। নিশাচর কয়েকটি ছায়ামানবকে উপেক্ষা করে রাজার কণ্ঠ কানে বাজতে লাগলো- “যারা পিতাকে হত্যা করতে পারে তারা জারজ না কী আপনিই বলুন”।

সুবহে সাদিকের পরের গাঢ় অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। বিছানার দিকে এগিয়ে গেলাম।  দু’চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। চোখের উপর ভাসছে কয়েকটি ছায়া মূর্তি, লেপ্টে থাকা দু‘টি ছায়া। কানে বাজছে বেসুরো মেয়েলী কান্না। অশ্লীল কয়েকটি শব্দ।  নিউরন সেলে বার বার আঘাত হানছে – যারা পিতাকে হত্যা করতে পারে তারা জারজ ।

.

.

লেখক :
ফ্রিল্যান্স লেখক ও প্রভাষক, বাংলা বিভাগ,
লতিফা সিদ্দিকী ডিগ্রি কলেজ, কুমিরা, চট্টগ্রাম।

Share via
Copy link
Powered by Social Snap