কবি : বাংলা সাহিত্যের অনন্য উপাখ্যান

প্রকাশিত: ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ, মে ১৯, ২০২০

কবি : বাংলা সাহিত্যের অনন্য উপাখ্যান

.

ফরহাদ আরজু

.

“রামায়ণের কবি বাল্মিকী ডাকাত ছিলেন বটে, তবে তিনি ছিলেন ব্রাক্ষণের ছেলে। সেও ভগবৎ লীলা। কিন্তু কুখ্যাত অপরাধপ্রবণ
ডোমবংশজাত সন্তানের অকস্মাৎ কবিরূপে অাত্মপ্রকাশকে ভগবৎ-লীলা বলা যায় কীনা। সে বিষয়ে কোন শাস্ত্রীয় নজির নাই।”

তবে অন্ত্যজশ্রেণীর নিতাই অকস্মাৎ কবিরূপে অার্বিভূত হল। নিতাইচরণের জন্ম ইতিহাসবিখ্যাত লাঠিয়াল ডোমবংশে। নিতাই খুনির দৌহিত্র, ডাকাতের ভাগনে, ঠেঙ্যাড়ের পৌত্র এবং সিঁদেল চোরের পুত্র। দীর্ঘ সবল পেশী, তীক্ষ্ণ ও বিনীত দৃষ্টির নিতাইয়ের গায়ের রং কালো। লেখকের ভাষায় ” রাত্রির অন্ধকারের মত”। ছোটবেলা থেকে বীরবংশীয় ঐতিহ্য ডাকাতির প্রতি তার মনোযোগ ছিল না। কবিয়াল হওয়ার বাসনায় ঘর ছেড়ে নিতাই অাশ্রয় নেয় রেলওয়ে পয়েন্টসম্যান রাজার কাছে। রাজার বাসায় নিতাই একদিন রাজার শ্যালিকা ঠাকুরঝিকে দেখে প্রেমবোধ অনুভব করে। কালো বর্ণের নিটোল ও সৌষ্ঠব দেহের ঠাকুরঝিকে রাজা ‘অালকাতরার মত রং’ বলে ঠাট্টা করলে নিতাই গান বাঁধে, “কাল যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে? কালো কেশে রাঙা কুসুম হেরেছে কি নয়নে?” নিতাই এখন দাঁড়াইয়া থাকে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রেললাইন দুটি বিন্দুতে যেখানে মিলিয়ে যায় সে পথে। ঝাপসা অাস্তরণের মধ্যে একটি স্বর্ণবিন্দুশীর্ষ কাশফুল সে দেখিতে পাই। ঠাকুরঝি অাসছে। ঠাকুরঝি তার মনের মানুষ। অাপন মনে গেয়ে চলে, “ও অামার মনের মানুষ গো! তোমার লাগি পথের ধারে বাঁধলাম ঘর!” ঠাকুরঝি পাশের গ্রামের বঁধু। সুখের সংসার, স্বামী অাদরনীয়। তার ইচ্ছে হয় ঠাকুরঝিকে নিয়ে পালিয়ে যাই। অথচ সমাজ – সংসারের বাস্তবতা এবং লোকচক্ষুর ভয়ে নিতাই থমকে দাঁড়ায়। ঠাকুরঝি নিতাইয়ের কাছে চাঁদের মত। নিতাই অাপন মনে কলি বাঁধে, “চাঁদ তুমি অাকাশে থাক -অামি তোমায় দেখব খালি ছুঁতে তোমায় চাইনাকো হে – সোনার অঙ্গে লাগবে কালি।” ঠাকুরঝি সুখে থাকুক, সংসার সুখে থাকুক ; চাঁদের মতো অাকাশে থাকুক। গ্রাম ছেড়ে সে ট্রেনে উঠে পড়ে কাটোয়ার উদ্দেশ্যে। সেখানে অাছে তার প্রিয়জন বসন ( বসন্ত)। বসন্ত ঝুমুর দলের নাচিয়ে। রাত যখন বাড়ে তখন দেহসাজিয়ে তারা খদ্দরের জন্য অপেক্ষা করে। দেহোপজীবিনী ঝুমুরের চোখের সাদা ক্ষেতে যেন ছুরির ধার, ছুরি নয় – সুচ, বুকের মধ্যে বিঁধে ভেতরকে তন্নতন্ন করে দেখতে পায়। অল্প সময়ে অন্যকে অাকৃষ্ট করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে তার। নিতাইকে সে ডাকে কয়লা-মানিক। নিতাই কয়লা মানিক থেকে বসন্তের কালো-মানিক হয়ে উঠে । নতুন জীবনে নিতাই দিন কাটাতে লাগলো। কবি হিশেবে ‘কালো কোকিল’ তার নামডাক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ঝুমুর দলের হয়ে সে অাসর মাতিয়ে তোলে। জীবনস্রোতের টানে সে কোথায় এল,ঠাকুরঝি কোথায় ভাসিয়ে গেল, রাজা কোথায় গেল! বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে,তার ইচ্ছে হয় পালিয়ে যাই অথচ বসন্তকে ছেড়ে সে পালাতে পারে না। বসন্তকে সে ভালোবাসিল। দুই হাত দিয়ে বুকে জড়াইলো অথচ ঠাকুরঝিকে সে ভুলতে পারলো না। বসন্তকে একজীবনে ভালোবেসে শেষ করা যাবে? নিতাইয়ের বড় অাক্ষেপ! “ভালোবেসে মিটল না সাধ, কুলাল না এ জীবনে! হায় – জীবন এত ছোট কেনে? এ ভুবনে?” ‌বসন্তের সাথে গাঁটছাড়া বাঁধতে চাই নিতাই। কাশ রোগের বসন্ত মদ খাওয়া কমিয়ে দিয়ে এখন নিয়মিত দুর্বাঘাসের রস খায়। তারও বাঁচার বড় সাধ। স্বামী – সংসার নিয়ে সুখে থাকার বড় ইচ্ছে। অথচ বিধিবাম। বসন্ত নিতাইয়ের কোলে ঢলে পড়ে। বিধাতার প্রতি তার অভিমানী মন বড় তীক্ষ্ণ। মৃত্যুকালীন অস্থিরতার মধ্যে নিতাই গোবিন্দের নাম উচ্চারণ করতে বললে বসন্ত বলে- “না। কি দিয়েছে ভগবান অামাকে? স্বামীপুত্র ঘরসংসার কি দিয়েছে? ” বসন্তের মৃত্যুর পর নিতাই চলে যায় কাশীর পথে ভগবান বিশ্বনাথের মন্দির। সুখ কোথায়? এখানকার গঙ্গা যেন অন্য ভাষায় কলকল ধ্বনি তোলে। পাখিরা “বউ কথা কও” কয় না। মানুষজন যেন অচেনা,অন্য রকম। তার গানের প্রিয়তা যেন নেই তাদের মাঝে। নিতাই অাবার পথধরে, গ্রামের পথ। রাজার কাছে দুটো শব্দ শুনে তার বুকে ঝড় ওঠে, চোখ ফেটে জল অাসে। ঠাকুরঝি মারিয়াছে। নিতাই চলে যাওয়ার পর পাগল হয়ে মরিয়াছে। নিতাই ভাবে, ঠাকুরঝি মরে নাই। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, রেললাইনের পথ ধরে সোনার টোপর মাথায় দিয়ে হেলেদুলে ঠাকুরঝি অাসছে। তার মনে পড়লো, হায় – জীবন এত ছোট কেনে? তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় “কবি” উপন্যাসে নিতাইয়ের কবি প্রতিভা এবং ভালোবাসার প্রণয়াবেগ উপন্যাসটিকে পাঠকপ্রিয়তা দান করেছে। কাহিনি নির্মাণ,চরিত্র সৃষ্টি, পরিবেশ বর্ণনা, নিম্ন শ্রেণির মানুষের প্রেমবোধ, বাঁচার অাকুতি এবং তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতা তিনি তুলে ধরেন পাকা হস্তে। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে নানা প্রশ্নের উদ্রেক সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে হৃদয়। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দশটি উপন্যাস বেছে নিতে বলা হলে গ্রন্থটি তাতে স্থন করে নেবে বলে নিঃসন্দেহে বলা যায়।

.

লেখক : সরকারি কর্মকর্তা

Share via
Copy link
Powered by Social Snap