দুবাইতে নারী পাচারকারী ফটিকছড়ির আজম সিআইডির হাতে আটক

প্রকাশিত: ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২০

দুবাইতে নারী পাচারকারী ফটিকছড়ির আজম সিআইডির হাতে আটক

 

হালদা-২৪ ডেস্ক :
ফটিকছড়ির কুখ্যাত সন্ত্রাসী আজম । তার বিরুদ্ধে ছয়টি হত্যা, সাজা প্রাপ্তসহ ১৫টি মামলা রয়েছে। শুরুতে এলাকায় চোর হিসেবে পরিচিত ছিল আজম । পরে বনে যান কুখ্যাত সন্ত্রাসী আজম খান।

স্থানীয়রা জানায়, ফটিকছড়ির পৌর সভার ৪ নং ওয়ার্ডের কেরিমুহুরীর বাড়ির মাহবুবুল আলমের ছেলে মোহাম্মদ আজম খান ওরফে মজাহার প্রথম জীবনে ছিল ছিটকে চোর।পরে দুর্ধর্ষ ক্যাডার ওসমান বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিল। সে ফটিকছড়ি থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। সে ২০০৪ সালে নানুপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি কামাল উদ্দিনকে জবাই করে হত্যাসহ ৬ টি হত্যা মামলার আসামি বলে ফটিকছড়ি থানা সুত্র জানায়। এছাড়া অস্ত্র চাঁদাবাজি লুটপাট অপহরণসহ আরো ৯ টি মামলা রয়েছে আজম খানের বিরুেদ্ধ। ২০০৪ সালে র‍্যারব পুলিশের যৌথ অভিযানে এলাকায় টিকতে না পেরে দুবাইতে পালিয়ে যান আজম খান।

সে থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। দুবাইতে অবৈধ নারী পাচার , হোটেল ব্যবসা করে বনে যান কোটিপতি।যেন টাকার কুমির পেয়েছে। জামায়াত বিএনপি ঘরণার রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তার রয়েছে দহরম মহরম রয়েছে বলে জানা যায়। এমনকি দলীয় র্শীষ নেতাদের দুবাই গেলে স্থান হয় আজম খানের হোটেলে।
২০০৭ সালের ফটিকছড়ি থানার চুরির এক মামলায় ২০১৫ সালে ৩ বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং দুই হাজার টাকা অর্থ দন্ড হয় তার।
ফটিকছড়ির মালয়েশিয়া প্রবাসী লিয়াকত আলীকে ঢাকায় অপহরণ করে ২০১৮ সালে ২০ কোটি টাকার চেক নিয়ে নেন । পরে লিয়াকত আলী থানায় মামলা দায়ের করেন।
লিয়াতক আলী বলেন, ব্যবসার কথা বলে আমার কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা নেন আজম খান। যৌথভাবে ব্যবসা চালু করবে এ শর্তে আমি টাকা গুলো দিয়েছি। কিন্তু সে আমার সাথে প্রতারণা করেছে। উল্টো আমাকে ঢাকা থেকে অপহরণ করে চেক ছিনিয়ে নেন।

সরেজমিনে আজমের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, বিদেশী নকশায় বাড়িটি নির্মাণে খরচ করা হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। তিন তলা বিশিষ্ট বাড়িটি এলাকার সকলের নজর কাড়ে। বাড়ীর গেইট এবং প্রবেশ পথ টাইলস দ্বারা গড়া। ঘরে ভিতরে নানা কারুকাজ এবং দামী আসবাবপত্র , ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রীতে সাজানো।
স্থানীয় আহমদ গণি বলেন, গত ৬ মাস আগে আজম খান বাড়িতে আসেন। এ সময় এলাকায় তিনি বেশ কিছু ক্লাবে খেলাধুলায় অতিথি হয়ে অনুদান প্রদান করেন।
ঘরে আজমের মা এবং স্ত্রীকে পাওয়া যায়। মা ছবিলা খাতুন বলেন, আমার ছেলের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আমার ছেলে দুবাইতে ফলফ্রুেটর ব্যবসা করে।
আজমের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বলেন, আমার স্বামী নারী পাচারের বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। সংসার জীবনে কখনো অনুমান করতে পারিনি।

ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবুল আক্তার বলেন, ফটিকছড়ির আজম খান ঢাকায় গ্রেফতারের কথা সংবাদ মাধ্যমে শুনেছি। থানায় তাঁর বিরুদ্ধে কোন মামলা তদন্তাধীন নেই। তবু আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।

ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আলহাজ্ব সরোয়ার আলমগীর বলেন, কুখ্যাত নারী পাচারকারী আজম খান নামে কেউ আমাদের ফটিকছড়ি বিএনপির সাথে জড়িত নেই। এধরণে রাষ্ট্রদ্রোহী ব্যক্তির যথাযথ বিচার দাবি করেন তিনি।

নারীপাচার চক্রে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়ে সম্প্রতি দুবাই পুলিশ আজম খান সম্পর্কে আরব আমিরাতের বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবহিত করে। আরব আমিরাত আজম খানের পাসপোর্টও বাতিল করে দেয়। এরপরই দুবাইতে বাংলাদেশ দূতাবাস পাসপোর্ট রেখে আজম খানকে দেশে পাঠিয়ে দেয়। এক্সিট পাস নিয়ে বাংলাদেশে এসেই তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

এক হাজারেরও বেশি নারীকে কাজ দেওয়ার নামে দুবাইতে নিয়ে যৌনকর্মে বাধ্য করেন আজম খান। সারাদেশ থেকে দালালের মাধ্যমে নারীদের সংগ্রহ করতেন আজম। হোটেলে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাদের জোর করে ড্যান্সবার ও যৌনকর্মে বাধ্য করা হতো। একেকজনকে ৫০ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়ার কথা বলে ওই নারীদের পাচার করা হয় দুবাইয়ে।

দুবাইয়ে নারীপাচার চক্রে তার আরও দুই ভাই জড়িত রয়েছে। দুবাইয়ে চার তারকাযুক্ত তিনটি ও তিন তারকা বিশিষ্ট একটি হোটেলের মালিক অভিযুক্ত এই আজম খান। তার মালিকানাধীন হোটেলগুলো হলো ফরচুন পার্ল হোটেল অ্যান্ড ড্যান্স ক্লাব, হোটেল রয়েল ফরচুন, হোটেল ফরচুন গ্র্যান্ড ও হোটেল সিটি টাওয়ার।

আরব আমিরাতের দুবাই থেকে পুলিশের তাড়া খেয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সেই ‘গডফাদার’ আজম খানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে কখন ও কোন্ জায়গা থেকে আজম খানকে ধরা হয়েছে সে তথ্য জানায়নি সিআইডি।

রোববার (১২ জুলাই) ঢাকায় সিআইডির সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অর্গানাইজড ক্রাইমের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, অভিযুক্ত ট্রাভেল এজেন্সি, বিদেশি এয়ারলাইন্স ও গ্রেপ্তারের তথ্য পরে জানানো হবে।

কিছুটা দেরিতে হলেও সিআইডি আজম খানসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকি দুই সহযোগী হলেন আল আমিন হোসেন ওরফে ডায়মন্ড ও আনোয়ার হোসেন ওরফে ময়না। গত ২ জুলাই এই ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে লালবাগ থানায় মামলা করেছে। পাচারের শিকার নারীরা ইতিমধ্যে জবানবন্দিও দিয়েছেন।তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইলে নারীদের যৌনকর্ম থেকে বাচার আকুতির অনেক ভিডিও রয়েছে বলে জানা গেছে।

সিআইডি বলছে, গডফাদার আজম খান সারাদেশ থেকে দালালের মাধ্যমে নারীদের সংগ্রহ করতেন। হোটেলে কাজ দেওয়ার কথা বলে জোর করে ড্যান্সবার ও যৌনকর্মে বাধ্য করা হতো ওই নারীদের। একেকজনকে ৫০ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়ার কথা বলে নারীদের দুবাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। একাধিক ট্রাভেল এজেন্সি ও বিদেশি কিছু বিমান সংস্থা এই কাজে আজম খানকে সহযোগিতা দিতো।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা আজম খানের বিরুদ্ধে দেশে ছয়টি হত্যা মামলাসহ ১৫টি মামলা রয়েছে। তার নারীপাচার ও যৌন নেটওয়ার্কে তিনি ছাড়াও দুবাইয়ে তার আরও দুই ভাই জড়িত। ভারত ও পাকিস্তান ভিত্তিক কয়েকটি দল আজম খানের সঙ্গে যুক্ত আছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Share via
Copy link
Powered by Social Snap