মানবতা বেঁচে থাক করোনাকালের পরেও

প্রকাশিত: ৩:৫৬ পূর্বাহ্ণ, মে ১৫, ২০২০

মানবতা বেঁচে থাক করোনাকালের পরেও

 

• হাসান মেহেদী

 

এই সেদিনও বিশ্বমোড়লের আসনটি ধরে রাখতে মরিয়া ছিলো আমেরিকা। এর ওর পেছনে উঁকিঝুঁকি মেরে নিজের কল্পিত শত্রুদের খুঁজে বের করার মার্কিনীয় কসরতে অনেক উলুখাগড়া দেশকে খেতে হতে হয়েছে ভীমড়ি। কত দিন আর হবে পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে যুদ্ধের দামামা এই বেজে উঠছিলো বলে। ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অসংখ্য নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিলো। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন নিয়ে তুলকালাম অবস্থা। আমার প্রাণের বাংলাদেশইবা বলি না কেনো? রাজনৈতিক টুকাটুকি লেগেই তো থাকতো রাজপথ কিংবা টকশোর মঞ্চজুড়ে। পাশের মিয়ানমারের রোহিঙ্গানিধন, সিরিয়ায় তথাকথিত ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা, চিনের উইঘুরে সাম্প্রদায়িক নিধনযজ্ঞ, কাশ্মীরের অস্থিরতা শান্তিকামী মানুষকে সন্ত্রস্ত করে রাখতো। টেলিভিশনের পর্দা আর ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার পাতা ছিলো যুদ্ধবাজদের দখলে। সাম্রাজ্যবাদীদের আস্ফালনে মানবতাবাদীরা ছিলো কোনঠাসা। দৃশ্যপট পুরোটাই বদলে গেছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে আগের মোড়ল আর খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট দৃষ্টি দেয় সংক্রমণ রোধে কর্মহীনদের খাদ্য সহায়তা দানকারী শেরপুরের ভিক্ষুক নাজিম কিংবা চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল বাগানবাজারের ক্ষুদ্র তরকারি ব্যবসায়ী তাজুল ইসলামের উপর। মিডিয়ার সংবাদ মূল্যের শর্ত ‘প্রমিনেন্ট’ এর যেনো ধরণই বদলে গেছে। এতো কিছুর মূলে যে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ (করোনা) তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বলতে গেলে বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ হলো-করোনাভাইরাস। তাবত ক্ষমতাধর রাষ্ট্র পর্যন্ত আক্ষরিক অর্থেই কোণঠাসা এই ভাইরাসের প্রতাপে। গোটা বিশ্বের আতংক হিসেবে আবির্ভূত হওয়া করোনাভাইরাস ২০১৯ সালের গোড়ার দিকে চিনের উহান প্রদেশে দেখা দিলেও বর্তমানে এর একচ্ছত্র আধিপত্য বিশ্বজুড়ে। করোনা সারা পৃথিবীর স্বাস্থ্যখাতকে করে দিয়েছে একেবারে লণ্ডভণ্ড। অর্থনীতিতে করে দিয়েছে তছনছ। বলতে গেলে হাজার বছরের তিলে তিলে গড়ে তোলা বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, প্রযুক্তির তাবত অর্জনকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। করোনা মোকাবেলায় সভ্য দেশের বাঘা-বাঘা বিজ্ঞানীদের সামনে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন। আর তাতেই করোনার বাজিমাৎ। বিশ্বের সমস্ত দাম্ভিকতাকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে বিশ্ববাসীকে ভাবাতে শুরু করে দিয়েছে নতুন করে। করোনানামীয় অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে বিশ্বমোড়লদের আজ করুণ আত্মসমর্পণ। ক্ষমতার আধিপত্য, অর্থের অহমিকার পরাজয়ে নতুন করে মানবিকতার বিজয়গাথা রচিত হচ্ছে। প্রমাণিত হয়েছে বিত্তের চেয়ে চিত্ত বড়। আর সে কারণেই সংক্রমণ রোধে কর্মহীনদের খাদ্য সহায়তা গঠিত ইউএনও’র ত্রাণ তহবিলে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারেন ৮০ বছর বয়সী ভিক্ষুক নাজিম উদ্দিন আর আরেক হতদরিদ্র তাজুল ইসলাম। নাজিম ভিক্ষা করে সংসার চালান। নিজের বসতঘর মেরামত করার জন্য দুই বছরে ভিক্ষা করে জমিয়েছেন ১০ হাজার টাকা।কিন্তু জমানো টাকা দিয়ে ঘর মেরামত না করে কর্মহীনদের খাদ্য সহায়তার জন্য খোলা তহবিলে দান করে মানবিক মনুষ্যত্বের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। আর তাজুল ইসলাম নিজের ঘরে সোমন্ত চার কন্যাসন্তান থাকার পরও নিজের একমাত্র অবলম্বন গাভীটিকে বিক্রি করে তার মতোই অন্য কিছু দরিদ্র মানুষের হাতে সাহায্য তুলে দিতে পেরেছেন। দেশের বড় বড় শিল্পপতি, বিত্তবান ধনাঢ্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে পেশাজীবী, সামাজিক সংগঠন এমনকি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন কেউ বাদ যাচ্ছে না দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো থেকে। রাষ্ট্রের সমস্ত মনোযোগ এখন জনগণের কল্যাণ চিন্তায়। মোড়ল রাষ্ট্রগুলোও অস্ত্র উৎপাদনের পরিবর্তে মনোযোগ দিয়েছে টিকা ও ওষুধ উদ্ভাবনে। বিশ্বব্যাপী মুখ তুবড়ে পড়া অর্থনৈতিক অবস্থার পরও সবার নজর এখন মানুষের কল্যাণে। ট্রাকভর্তি ত্রাণের প্যাকেট পৌঁছে যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। নামদাম গোপন রেখেও দান করছেন অনেকে। চারদিকে এমন মানবিক উদ্যোগ করোনায় বিপর্যস্ত সময়ে মনের ভালোলাগায় একটুখানি দোলা দিয়ে যায়। করোনাকালের পরে একটি মানবিক বিশ্ব গড়ে উঠবে বলে আশা জাগায়। করোনাকালের পরেও যেনো মানবতা বেঁচে থাকে- রোজকার প্রার্থনায় এটাও যুক্ত হোক।

 

লেখক : ফ্রিল্যান্স লেখক ও প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, লতিফা সিদ্দিকী ডিগ্রি কলেজ, কুমিরা, চট্টগ্রাম।

 

 

Share via
Copy link
Powered by Social Snap